ইসলাম অবমাননার দায়ে এদেশের মুসলমান কত মানুষকে পেটাল, হত্যা করল, দেশছাড়া করল, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিল, কিন্তু তারা নিজেই মুসলমান নয়, নিজেই মানে না ইসলামের বিধান। ইসলামের বিধান দিয়ে এদেশের মুসলমানদের কার্যকলাপকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজনও মুসলমান নেই।
ইসলাম বলছে গান হারাম, কিন্তু এদেশের এমন কোনো মুসলমান নেই, যিনি গান শুনেন না। ইসলাম বলছে সুদ হারাম, কিন্তু এদেশের এমন কোনো মুসলমান নেই, যিনি সুদ খান না। ইসলাম বলছে মিথ্যা বলা হারাম, কিন্তু এদেশের মুসলমান মিথ্যা দিয়েই দিনের শুরু করেন। ইসলাম বলছে বেগানা নারী/পুরুষের সাথে কথা বলা যাবে না, তাকানো যাবে না, কিন্তু এদেশের এমন কোনো মুসলমান নেই, যারা বেগানা নারী/পুরুষের দিকে তাকান না, কথা বলেন না। তাদের বিয়েই হয় বেগানা নারী পুরুষ ভালোবাসাবাসি করে। পারিবারিক আলোচনা হওয়ার আগেই প্রথম দেখায় একে অন্যকে পছন্দ করে মন দেওয়া নেওয়া সেরে নেন তারা। বিয়ের কল্পনা অবধি পৌঁছে যান; স্বামী/স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করে নেন, একে অন্যকে; পরকীয়া তো রয়েছেই৷
ইসলাম বলছে চার বিয়ে করার সামর্থ্য থাকলে করতে, কিন্তু মুসলমান পুরুষরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চার বিয়ে করেন না। নারীরা স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেন না। ইসলাম বলছে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী চার মাসের অধিক পরস্পর দূরে অবস্থান করতে পারবে না। কিন্তু এদেশের মুসলমান পুরুষরা বছরের পর বছর বিদেশে পড়ে থাকেন স্ত্রীকে দেশে রেখে। ইসলাম বলছে, বাপ-মা বা সন্তান, বেনামাজি হলে এদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে, জিহাদ করতে, কিন্তু এদেশের মুসলমান কিছুই করেন না।
ইসলাম বলছে স্ত্রীকে বিছানায় ফেরেশতার অভিশাপের ভয় দেখিয়ে ডেকে নিতে হবে, কিন্তু এদেশের পুরুষরা প্রেমিক, লাভার বয়; তারা স্ত্রীর মুড বুঝেন, ইমোশনালি বিছানায় ডাকেন৷ ঘুণাক্ষরেও কেউ বলেন না, বিছানায় না এলে ফেরেশতা অভিশাপ দিবে। ইসলাম বলছে দেন মোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করে স্ত্রীর গায়ে হাত দিতে, কিন্তু এদেশের পুরুষেরা মৃত্যুর আগ অবধি পরিশোধ করেন না। ইসলাম বলছে মেয়েদের সম্পত্তির ভাগ বুঝিয়ে দিতে, কিন্তু এদেশের পুরুষরা বোন বা কন্যার ভাগ কখনোই দেন না; বরং তারা চাইতে এলে, আত্মীয়তা আর থাকে না।
মেয়ে বাপের বাড়ি থেকে নিজের ভাগের সম্পত্তি নিয়ে নিলে, সমাজে তাকে অপমানিত হতে হয় প্রতিনিয়ত। ভাইয়েরা আর বোনের সাথে যোগাযোগ রাখেন না। ইসলাম বলছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না, কিন্তু এদেশে প্রায় মুসলমানের আত্মীয়ের সাথে কলহ। এমনকি ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, ভাইয়ের সাথে বোনের, বোনের সাথে বোনের, সন্তানের সাথে পিতা-মাতার সম্পর্কে কলহ আর কলহে ভরপুর। ইসলাম বলছে, ওয়াদা ভঙ্গ করা যাবে না, কিন্তু এদেশের মুসলমান ওয়াদা ভঙ্গ না করে পারেন না।
ইসলাম বলছে নেশা-জাতীয় দ্রব্য খাওয়া, বা পান করা যাবে না, কিন্তু এদেশের মুসলমান, জর্দা-পান-সিগারেট-মদ না হলে চলতে পারেন না। ইসলাম বলছে এশার নামাজের পর ঘুমিয়ে যেতে, এতেই পুণ্য; কিন্তু এদেশের মুসলমান ঘুমান ফজরের আজানের সাথে। তারা নবীজিকে মানেন, কিন্তু নিজের সুবিধামতো। নবীজি যেভাবে খেতেন, যেভাবে ঘুমাতেন, যেভাবে হাঁটতেন, কেউই সেভাবে তাঁকে অনুকরণ করেন না। ইসলাম বলছে, কম খেতে, কম কথা বলতে, কিন্তু এদেশের মুসলমান, আলেমরা-সহ বেশিমাত্রায় খান, বেশিমাত্রায় কথা বলেন।
ইসলাম বলছে মেয়েদের বালেগা হলেই বিয়ে দিতে হবে, কিন্তু এদেশের মুসলমান মেয়েদের বিশ-পঁচিশের আগে বিয়ে দেন না। কেউ দিলে সেটাকে আবার ঘৃণার চোখে দেখেন। উনারা নবীজির করা কাজকে সুন্নত মনে করেন, কিন্তু চল্লিশ বছরের নারীকে কমবয়সী কোনো পুরুষ বিয়ে করলে, তাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন। ষাট বছরের কেউ কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে করলে, তাদের নিয়ে কুৎসা রটান। অথচ নবীজি দুটোই করেছেন, উনার ব্যক্তিজীবনে। সেটা কি সুন্নত নয়? শুধু খেজুর খাওয়াতে সুন্নত আঁটকে আছে এদেশের মুসলমানদের। ইব্রাহিম নবী ছিয়াশি বছরে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন। কিন্তু এদেশে চল্লিশ-প্লাস দম্পতি বাচ্চা নিলে মুসলমানরা হাসি-ঠাট্টা করেন। নবীজি কষ্টেসৃষ্টে জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু তাঁর উম্মতেরা এসির নিচে, অন্তত ফ্যানের নিচে, জাজিমের খাটে ঘুমান। রসূলের ঘরে চুলা জ্বলে নি মাসের পর মাস, কিন্তু এদেশের মুসলমানদের ফ্রিজে খাবারে ভরতি; পরে সেগুলো ডাস্টবিনে পড়ে। এ-বেলায় রসূলের সুন্নত উনাদের মনে পড়ে না। এ-বেলায় রসূলের জীবন উত্তম আদর্শ হয় না।
ইসলাম বলছে নামাজ ছাড়া যাবে না। এদেশের আলেমরা-সহ নামাজ সঠিকভাবে আদায় করে না। সাধারণ মুসলমান তো নামাজের ধারে-কাছেও যান না, ঠ্যালায় না পড়লে। ইসলাম বলছে জাকাত দিতে, এদেশের মুসলমান এক পয়সাও জাকাত দেন না। ইসলাম বলছে, ঋণ নিয়ে তাড়াতাড়ি ফেরত দিতে, এদেশের মুসলমান ঋণ নিয়ে লা-পাত্তা হয়ে যান। আরও কত কী যে আছে, সব তো মনে পড়ছে না। মোটামুটি এদেশের মুসলমান, ইসলামের কিছুই মানেন না।
এত এত এত ইসলাম অবমাননার পর, আল্লাহ ও রসূলের অবাধ্য হবার পর উনারা দাবি করেন, তারা মুসলিম। আবার অন্যের উপরে খড়গ হন ইসলাম অবমাননার দায় চাপিয়ে। হত্যা করতে উদ্ধত হয়ে উঠেন। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ভণ্ডামি কী হতে পারে, আমার জানা নেই। জীবনেও কুরআন সম্পূর্ণ পড়া দূর, ছুঁয়েও না দেখা লোক, কুরআন অবমাননার দায়ে কাউকে হত্যা করতে চান।
শুধুমাত্র মুখে বললাম আল্লাহকে রব মানি, মুহাম্মদকে আদর্শ মানি, কুরআনকে বিধান মানি, আর প্রাকটিস করলাম না আল্লাহ, রসূল, কুরআনের কোনো কথাই, তাহলে কীসের মুসলমান? কেমন মুসলমান আপনি? শুধুমাত্র মুখে তো আমিও বলি, সক্রেটিস বলে ইতিহাসে একজন আছেন, এই কথায় আমি বিশ্বাস করি। ট্রাম্প বলে একজন আছেন, এই থাকায় আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু সক্রেটিস, বা ট্রাম্পের কোনো কথাই আমি শুনি না, মানি না, পাত্তা দেই না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আমি দাবি করব, সক্রেটিস বা ট্রাম্পের উত্তরসূরী আমি? আমার সক্রেটিস বা ট্রাম্পের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া, আর আপনার আল্লাহ-রসূলের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? আপনিও তো আমার মতো, আল্লাহ-রসূলের কোনো কথাই মানেন না, যেমন আমি সক্রেটিস, ট্রাম্পের কোনো কথাই মানি না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে দাবি করেন আপনি মুসলমান?
কোনো কিছুকে শুধুমাত্র মুখে স্বীকৃতি দিলেই যদি সেটাকে ধারণ করা হয়ে যায়, তবে তো সন্তানকে মুখে স্বীকৃতি দিয়ে, তারপর দায়িত্ব না পালন করা লোকটাও পিতা হয়। তখন তো আপনারাই বলেন গদগদ করে, শুধু জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না। দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাহলে শুধু মুখে বললেই মুসলমান হয়ে যান কী করে? ভণ্ডামি বাদ দিয়ে আগে নিজেকে ঠিক করুন। আপনাদের অনেক স্টুপিডি-সহ্য করছে পৃথিবী। একবার আয়নার সামনে দাঁড়ান৷ প্রশ্ন করুন নিজেকে, আপনি কি মুসলমান হতে পেরেছেন? দেখবেন, না পারেন নি, উত্তর এসেছে। না মুসলমান, আর না হলেন মানুষ। অবশ্য, আপনাদের কাছে মানুষ হওয়া অপেক্ষা ধার্মিক হওয়া আগে। কেউ মানুষ হওয়ার কথা বললে, তাকে তাচ্ছিল্য করেন। কিন্তু অবশেষে ধার্মিকও হলেন না। কী এমন হয়েছেন আপনি? দয়া করে নিজেকে সংশোধন করুন।
আস-সালামু আলাইকুম— আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
ॐ শান্তিঃ ॐ শান্তিঃ ॐ শান্তিঃ। আপনার বিঘ্নমুক্ত, সুখময়, আনন্দময় জীবন কাটুক।
সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ। সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু, মা কশ্চিৎ দুঃখভাগভবেৎ। সকলে সুখী হোক, সকলের মঙ্গল হোক, সকলের দুঃখ নিরাময় হোক, সকলে সকলকে প্রেমের দৃষ্টিতে দেখুক, কখনো কেউ দুঃখ-কষ্ট বোধ না করুক।
.
— ইমাম হোসাইন
Post a Comment
যুক্তি সংগত কথা বলুন.................