যা পড়ানো হয় নি, সেগুলোও যথাসম্ভব কালেক্ট করার চেষ্টা করাই আমাদের মনুষ্যোচিত কর্তব্য।

তানহাজী মুভিটি বক্স অফিস হিট। হওয়ার কথাও, কারণ বীর্য, শৌর্য, দক্ষতা, আত্মসম্মান, দেশ ও মাতৃভক্তি এবং আদর্শের কাছে সর্বস্ব সমর্পণের যে বিমূর্ত চরিত্র ছিলেন তানহাজী মালেশ্বর, তা বিধৃত হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। 

যাঁরা সে ইতিহাস পড়েছেন তাঁরা জানেন। তাই তাঁকে নিয়ে একটি well-made মুভি তৈরি হলে তা মানুষের মনকে স্পর্শ করতে বাধ্য। তবে ভারতবর্ষে এই সময়ে যাঁরা বর্তমান প্রজন্ম, তাঁদের অধিকাংশই সে ইতিহাস হয়ত জানেন না, কারণ ভারতবর্ষের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। ভারতীয়দের শৌর্য, বীর্যের কাহিনীকে ছেঁটে ফেলে একপেশে ইতিহাস লেখার ঘরানা কং-কমি ইকোসিস্টেমের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। তবে কিনা সাহিত্যের আবেদন ঐতিহাসিক বর্ণনার আবেদনের চেয়ে বেশি এবং দ্রুততর। সেই সত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধুদের জন্য এখানে দিচ্ছি যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত একটি কবিতা যার নাম 'সিংহগড়'। কবিতাটি ক্লাস নাইনে আমাদের পাঠ্য ছিল। কবিতার প্রতি ছত্রে তানাজী মালেশ্বরের শৌর্য, বীর্যের দৃপ্ত, আবেগঘন বর্ণনা পাঠকের ধমনীতে রক্তস্রোতের গতি বাড়িয়ে দেয়। 

যাঁরা তানহাজী মুভি দেখে আপ্লুত হচ্ছেন এবং এই কবিতাটি হয়ত পড়েন নি, তাঁরা পড়তে পারেন এবং এর আবৃত্তি বাড়ির বাচ্চাদের শেখাতে পারেন। মুভির আবেদন চতুর্গুণ হয়ে যাবে এমনকি ছোটদের কাছেও। বাংলা সাহিত্যের নানা মণিমাণিক্যকেও পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ডেলিবারেটলি চেপে দিয়েছে। কেন দিয়েছে তা আমরা জানি, তাই সেই চর্বিতচর্বণ এখানে আর করব না, বরং 'সিংহগড়' কবিতাটি পড়লে বোধ হয় কিছু কাজের কাজ হবে। কবি, যতীন্দ্রমোহন বাগচী। 

-----------------------------------------------------------------------
সিংহগড়

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

উমরাটিপুরে সুবেদার-গৃহে সেদিন বাজিছে বাঁশি,
তানাজী-পুত্র রায়বার বিয়ে ; প্রমত্ত পুরবাসী ;
নানা আয়ােজন, ভারি ধুমধাম ; নৃত্য ও গীত চলে অবিরাম ;
দাঁড়াইল বর বাজিল শঙ্খ, জ্বলিল আলোকরাশি-
এ হেন সময় শিবাজীর দূত সভায় দাঁড়াল আসি।

পাঠ করি লিপি বজ্রকণ্ঠে হাঁকিল মালেশ্বর-
'নামাও বংশী, থামাও নৃত্য, সাজ খুলে ফেলো বর!
কঠিন বিবাহ ঘনায়েছে আজ তারি লাগি সবে পরো নব সাজ,
সেই মিলনের শুভলগ্নের সময় অগ্রসর-
রে বরযাত্রি! আগত রাত্রি - হও সবে সত্বর!'

লিপির বারতা শুনিল সকলে সাগ্রহে পাতি কান,
হাজার কণ্ঠে ধ্বনিল অমনি শিবাজীর আহ্বান।
অন্তঃপুরে পুরনারী যত শুনিল সে বাণী স্বপ্নের মতাে,
বিস্ময়-হত হিয়া শত শত, তবু নহে ম্রিয়মাণ,
নব-উৎসাহে উঠিল জ্বলিয়া পদাহত সম্মান।

বারো সহস্র মাওয়ালি সৈন্য সাজিল বারতা পেয়ে,
তাই লয়ে সাথে প্রচও তেজে চলিল তানাজী ধেয়ে।
রায়গড়ে আসি রাজারে শুধায়- ‘কি আদেশ প্রভু, ঘটিল কি দায় ?
উত্তরে শুধু কহিল শিবাজী - জননীর পানে চেয়ে,
‘আমি ডাকি নাই, ডেকেছেন তােমা - ভবানী মায়ের মেয়ে।'

জননী অমনি তানাজীর মুখে ঘুরায়ে প্রদীপখানি,
অঙ্গুলি ভাঙি ললাট পরশি বালাই লইয়া টানি ;
কহিল মধুর-গম্ভীর-রবে, ‘সিংগড় মোরে জিনে দিতে হবে,
বৎস আমার ! আজ হ’তে তােরে দ্বিতীয় পুত্র মানি।'
তানাজীর মুখে অপূর্ব সুখে বন্ধ হইল বাণী !•••

হাঁকি পুনরায় কহে জীজাবাই, 'ছি! ছি! তোরা কাপুরুষ !
বীরের কর্ম আপন ধর্মে করে সে নিষ্কলুষ ।
বেদ ব্রাহ্মণ নিষ্ঠা আচার ধর্ম যজ্ঞ বিবেক-বিচার—
চরণে দলিত হেরি বারবার, তথাপি হয় না হুঁশ—
ধিক্কারে ভরা লাঞ্ছনা তােরা মর্মে লুকায়ে থুস!--

‘তাই থাক্ তােরা লজ্জা লুকায়ে অন্ধ বিবরমাঝে,
থাক্ বারো মাস মােগলের দাস ঘৃণ্য অধম কাজে ;
আমি যাই - মাের ফুরায়েছে কাল, মিছে বেঁচে থাকা হয়ে জঞ্জাল,
আপনার মান পরেরে বিকায়ে লাঞ্ছনাভরা লাজে –
সিংহগড়ের দুর্গে আজিকে মোগল-ডঙ্কা বাজে।'

রুদ্ধ কণ্ঠে কহিল তানাজী ‘তাই হবে তাই হবে—
ফিরায়ে আনিব সিংহগড়ের নির্জিত গৌরবে ;
শপথ করিনু অসি ছুঁয়ে আজ, ঘুচাব রাষ্ট্র-কলঙ্ক লাজ,
অথবা পরাণ সঁপি দিব আজ মরণ মহোৎসবে—
ক্ষয়-ক্ষতি-লাজ ডুবাইব আজ বিজয়ের তাণ্ডবে।'

পরশিয়া পুনঃ মায়ের চরণ চলি গেল বীর ধীরে,
বারাে সহস্র মাওয়ালি সৈন্য চলিল সঙ্গে ঘিরে।
সিংহগড়ের দুর্গচূড়ায় সূর্য তখন স্বর্ণ কুড়ায়,
সন্ধ্যা তাহার রক্ত ছড়ায় ‘ডঙ্গী'-শৈলশিরে ;
দূরে সেনা রাখি চলিল তানাজী পাহাড়ের কোল ভিড়ে'।

তার পর যাহা— ইতিহাস তাহা শোনে নাই কোনো সালে ;
সত্য যাহার স্বপ্নের মতো– দীপ্ত ইন্দ্রজালে !
থার্মোপলির পুণ্য-কাহিনী, হলদিঘাটের ধন্য বাহিনী-
অপূর্ব কথা— তুলনা পাই নি তবু এর কোনো কালে,
ভাগ্য যে লিপি লিখিল সেদিন মহারাষ্ট্রের ভালে!

সপ্তাহ পরে এল রায়গড়ে সিংহগড়ের চর ;
শুনিল সকলে সভয়ে গর্বে জয় সে ভয়ংকর।
জীজাবায়ে শুধু কহিল শিবাজী— ‘সিংগড়, মাতা, ফিরি লও আজি ;
সিংহগড়ের সিংহ গিয়েছে— পড়ে আছে শুধু গড়—
তাই লও মাতা, হারায়ে পুত্র — তানাজী মালেশ্বর!'

-----------------------------------------------------------------------

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে ১৯৭৭ সালে। ক্ষমতায় এসে প্রথমে 'অপারেশন বর্গা' বা ভূমি সংস্কার করে তারা। ১৯৭৭ থেকে প্রায় ১৯৯০ পর্যন্ত  মূলতঃ এইসব কাজগুলিই করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। ইংরেজি তুলে দেওয়া, সিলেবাস বদলে দেওয়া বা ছোট করে দেওয়া, স্কুল শিক্ষায় পাশ-ফেল তুলে দিয়ে গ্রেড চালু করা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে শিক্ষাক্ষেত্রে মধ্যমেধার চাষ শুরু করার কাজ বা ইতিহাস বিকৃতি ও বিলুপ্তির কাজ তারা শুরু করে তার পরে। খুব যথাযথভাবে বলতে গেলে, এসব শুরু হয় 1989 সাল থেকে। তারপর ধাপে ধাপে পড়ে যেতে থাকে শিক্ষার মান। ইতিহাস বিকৃতি ও বিলুপ্তি, বাংলা সাহিত্যের নানা মণিমাণিক্যকে বিস্মৃতির আড়ালে পাঠিয়ে দিতে চাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে যে ইন্টেলেকচুয়াল টেররিজম এ রাজ্যে শুরু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার, তাকে পূর্ণ নরকগামী করার কাজ করেছেন এবং করে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই নব্বইয়ের দশকের স্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত বন্ধুদের উদ্দেশ্যে শুধু একটি আবেদন রেখেই এই লেখা শেষ করব। সেটি হল এই যে, আপনারা দয়া করে সচেতন থাকুন যে যা কিছু আপনাদের পড়ানো হয়েছে, সেটুকুই সব নয়। যা পড়ানো হয় নি, সেগুলোও যথাসম্ভব কালেক্ট করার চেষ্টা করাই আমাদের মনুষ্যোচিত কর্তব্য।

0/Post a Comment/Comments

যুক্তি সংগত কথা বলুন.................

Stay Conneted