নেতাজি বনাম মুসোলিনি, অমৃতস্য পুত্রাঃ

নেতাজি বনাম মুসোলিনি, অমৃতস্য পুত্রাঃ বনাম Übermensch / দেবাশিস লাহা 

“Considering everything, one is inclined to hold that the next phase in world-history will produce a synthesis between Communism and Fascism and will it be a surprise if that synthesis is produced in India?”--- Indian Struggle

সব দিক বিবেচনা করে এমন মনে হওয়াই স্বাভাবিক বিশ্ব ইতিহাসের পরবর্তী পর্বটি কম্যুনিজম এবং ফ্যাসিবাদের মধ্যে একটি সমন্বয় হিসেবেই গড়ে উঠবে। আপনারা কি বিস্মিত হবেন যদি সংশ্লেষটি এই ভারতবর্ষের মাটিতেই বিকশিত হয় ? 

আজ ২৩ শে জানুয়ারির এই পবিত্র লগ্নে যে সব কাঁদি কাঁদি “জন নেতা”, “সমাজসেবী”, গোতু, মোতু, হনু, নুনু, চুনু, হোঁদল, মাদল, আমরুল, জামরুল, কামরুল, দলিত, গলিত, চলিত ইত্যাদি যারা নেতাজী নামক অবিশ্বাস্য ভূমিপুত্রকে মালা পরাবেন, তারা কজন Indian Struggle এ উল্লিখিত উদ্ধৃতিটি পড়েছেন অথবা এ সম্পর্কে অবগত আছেন ? সেনাবাহিনীর ফেটিগ পরিহিত প্রতিকৃতিটির সামনে দাঁড়িয়ে হাস্যকর উচ্চারণে “জয় হিন্দ” বললেই কি এই যুগপুরুষটির জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব ? তারা কি জানেন নেতাজীর আদর্শ বাস্তবায়িত হলে এই সব গোতু মোতু হনু নুনুদের স্থান আস্তাকুড়, ডাস্টবিন ছাড়া কোথাও খুঁজে পাওয়া যেতনা। বুলেট বিদ্ধ লাশের গণ অন্ত্যেষ্টি বোঝেন ? হ্যাঁ, ঠিক সেটাই ঘটত। আপাদমস্তক দুর্নীতিপরায়ণ এই সব সামাজিক আগাছা যখন নেতাজীকে শ্রদ্ধা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আমার বড্ড হাসি পায় ! কেন পাবেনা ? কালা হিট কন্টেইনারের সামনে সমবেত হয়ে রাশি রাশি আরশোলা যদি জয় হিন্দ বলে চেঁচিয়ে ওঠে অথবা নর্দমাবাসী মশা মাছির দল কীটনাশকের বোতলকে তাদের পরিত্রাতা হিসেবে ঘোষণা করে, তবে কি হাসি চাপা সম্ভব ? উঁহু একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। গুণ এবং মেধার পূজারী নেতাজী যে ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানে কোটাকে সবার আগেই ঝাঁটা মারা হত, আর বিনা পয়সার সাইকেলখোর মাইকেল ? তাদেরও একই পরিণত হত। 

কেন বলুন তো ? সমসাময়িক বিশ্বে নেতাজীর সবচেয়ে প্রিয়পাত্র কে ছিলেন বলুন তো ? স্তালিন ? উঁহু একদম নয়। কি বললেন ? মহাত্মা গান্ধী ? খেপেছেন ? নেহেরু ? হা হা হা। এক গ্লাস জল খেয়ে নিন। হিটলার ? কাছাকাছি গেছেন। খাঁটি উত্তরটি হল মুসোলিনি। ইতালির সর্বাধিনায়ক বেনিটো মুসোলিনি। কী অবাক হলেন নাকি ? প্রিয় নায়ক বেনিটো মুসোলিনি নামক এক "ভয়ংকর" "হিংস্র" ফ্যাসিবাদী একনায়ককে   স্বরচিত Indian Struggle বইটি উপহার দেওয়ার জন্যই ১৯৩৫ সালে রোম যাত্রা করেছিলেন। নেতাজীর সঙ্গে মুসোলিনি তথা ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক, তাঁর ভারত বীক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে একটি বিশদ আলোচনা কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিতব্য বইটিতে [অমৃতস্য পুত্রাঃ] রেখেছি। আজকের আলোচনাটি ভিন্ন একটি বিষয়ের উপর কেন্দ্রীভূত করব।তার আগে একটি সহজ প্রশ্ন করি—ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ এবং মার্ক্সবাদী সাম্যবাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্যটি কি বলুন তো ? আরও সহজ করে বললে মুসোলিনি, হিটলার এবং লেনিন/ স্তালিনের মধ্যে কমন ফিচার কি বা কোনটি ? উত্তর খুব সোজা। এঁরা এবং এঁদের দর্শন আপাদমস্তক গণতন্ত্র বিরোধী। অর্থাৎ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি তীব্র অনাস্থা এবং ঘৃণা। এঁরা যে ব্যবস্থাটির জন্ম দিয়েছিলেন সেখানে গণতন্ত্রের কোনো জায়গাই ছিলনা। তবে প্রথম দুটির [ফ্যাসিবাদ/ নাজিবাদ] জন্য এত ঘৃণা আর তৃতীয়টির জন্য এত ভালবাসা বর্ষিত হয় কেন ? [আমি এদেশ, বিশেষ করে এই রাজ্যটির কথা বলছি। প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে এখন তিনটিকেই এক ব্র্যাকেটে রাখা হয়।] এর উত্তরটিও সোজা। কারণ প্রথমদুটি[ ফ্যাসিবাদ এবং নাজিবাদ] মেধা তথা উৎকৃষ্ট গুণাবলির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র তথা রাজনীতি নির্মাণের পক্ষে সওয়াল করেছিল। অর্থাৎ জ্ঞানে, গুণে, শিক্ষায়, দীক্ষায় এগিয়ে থাকা শ্রেণিটির হাতেই সামাজিক/ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ভার থাকবে। কিন্তু মার্ক্সবাদী সাম্যবাদে ঠিক এর বিপরীত কথাই বলা হয়েছে। সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অশিক্ষিত, মেধাহীন শ্রেণিটি [যাদের সর্বহারা বলে চিহ্নিত করা হয়] সামাজিক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকবে। অর্থাৎ individual glory/ potential কে পদদলিত করে mass culture কে প্রোমোট করার লক্ষ্যে একটি আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা। আম্বেদকরীয় সংবিধানে সজ্জিত এবং অশিক্ষিত, মেধাহীন মানুষকে মোহরা বানিয়ে যে রাজনীতির জন্ম হয়েছে সেখানে যে নিম্ন মেধাকে প্রশ্রয় দেওয়া মার্ক্সীয় সাম্যবাদটির জয়গান গাওয়া হবে, অত্যন্ত স্বাভাবিক। বলাই বাহুল্য নেতাজী এমন কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবতেননা, যেখানে নিকৃষ্ট জনগোষ্ঠীকে মাথায় তোলা হবে। উচ্চ মেধাকে পদদলিত করে নিম্ন মেধাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে। তবে মুসোলিনি কেন? হিটলার নয় কেন ? এর উত্তরও সহজ। প্রথমেই মনে রাখতে হবে মুসোলনির প্রতি অনুরাগ থাকলেও নেতাজী কখনও তাঁকে হুবহু কপি করার কথা বলেননি। নাজিবাদের চাইতে ফ্যাসিবাদকে অধিকতর উত্তম বলেছেন মাত্র। racial supremacy তে বিশ্বাস রাখলেও মুসোলিনি এবং তাঁর ফ্যাসিবাদ কখনও হিটলারের কায়দায় ইহুদি নির্যাতনে অংশ গ্রহণ করেনি। সমর্থনও করেননি। তাঁর দেশে ইহুদের যতটুকু সমস্যা হয়েছিল সেটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফসল। যেহেতু জার্মানি এবং ইটালি একই যুদ্ধ গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত ছিল। একারণেই নেতাজী মুসোলিনিকে অনেক এগিয়ে রেখেছিলেন। হিটলার এবং মুসোলিনি সম্পর্কে একটি প্রচলিত ম্যাক্সিম আছে। কেউ কেউ হয়ত শুনে থাকবেন। 
Mussolini was a first class dictator of third class people, Hitler was a third class dictator of a first class people. 
ইটালি সফরে গিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। অবশ্য ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে সেই বক্তব্য ফিরিয়ে নেন। কারা চাপ দিয়েছিল, কেন চাপ দিয়েছিল সেই আলোচনা আগামী সংকলনেই রেখেছি। 
যাক সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আগেই জানিয়েছি আজকের বিষয়টি ভিন্ন। আর এই ভিন্ন বিষয়টিতে যাওয়ার জন্যই আর একটি প্রশ্ন জরুরী। আমরা সবাই কম বেশি জানি মার্ক্সবাদকে ভিত্তি করেই লেনিন বলশেভিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। সফলও হয়েছিলেন। যদিও সেই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মুসোলিনি বা হিটলার ? তাঁরা কার আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন ? তাঁরা কি কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ? আলবৎ হয়েছিলেন। কে সেই দার্শনিক ? কেন ফ্রিডরিখ নীৎসে [জার্মান উচ্চারণ নীজে]। দুজনেই কি একই মাত্রায় প্রভাবিত হয়েছিলেন ? উঁহু মোটেই না। মুসোলিনিকে দেখেই হিটলার অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, কারণ তাঁর অনেক আগেই ইতালিতে ফ্যাসিবাদের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। কিন্তু হিটলার স্বয়ং নীৎসের বইপত্র পড়ে দেখেছিলেন বলে মনে হয়না। তাঁর সেই মেধা এবং উপলব্ধি ছিলনা। তিনি  মুসোলিনিকে যতটা অনুকরণ করেছিলেন তা নিছক কৌশলগত। তবে কে পড়েছিলেন ? অবশ্যই মুসোলিনি। শুধু পড়েছিলেন বললে ভুল বলা হবে, অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলেন। কারণ সেই মেধা তাঁর ছিল। নগন্য কামারের পুত্র হয়েও তিনি বিশ্ব ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতিতে সুপণ্ডিত ছিলেন। এক ডজন ভাষার উপর দখল রাখা মানুষটির অধ্যয়নের আগ্রহ সত্যিই বিস্ময় জাগায়। এক্ষেত্রে তিনি নেতাজীর সমতুল্য। আমাদের প্রিয় নেতাটিও সমান আগ্রহে হেগেল, কান্ট, ফ্রয়েড, ইয়ুং পড়েছিলেন। সুধী পাঠক নিশ্চয় ধরে ফেলেছেন আজকের আলোচনাটি এই ফ্রিডরিখ নীৎসেকে কেন্দ্র করে। কেই এই দার্শনিক ? কি তাঁর দর্শন যা বিংশ শতাব্দীতে এমন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা গ্রহণ করল ? মুসোলিনি হিটলার নেতাজীর মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নয়, তাবড় তাবড় দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ কেনই বা তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হল ? কে নেই এই তালিকায় –কাম্যু, ফুকো, দেরিদা, ফ্রয়েড, ইয়ুং, সার্ত্র, স্ট্রস, গোল্ডম্যান, হাইডেগার ! 

এই ক্ষুদ্র পরিসরে এত বড় মাপের দার্শনিককে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা অসম্ভব। তাই সেই অংশগুলিই ছুঁয়ে যাব যা ফ্যাসিবাদ, মুসোলিনি এবং অবশ্যই আমাদের নেতাজীকে কিঞ্চিৎ হলেও বুঝতে সাহায্য করবে। 

মাত্র চুয়াল্লিশ বছরেই চিন্তা এবং স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা [ পড়ে যাওয়ার ফলে মস্তিষ্কে আঘাত পান] এই প্রতিভাটি [1844  1900] কী এমন লিখে গিয়েছিলেন ! অবাক হবেন না। ডক্টরেট সম্পূর্ণ করার আগেই, কোনো শিক্ষকতার শংসা পত্র ছাড়াই মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তিনি সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার আমন্ত্রণ পান। এত কম বয়সে এই সম্মান সত্যিই বেনজির। Human, All Too Human ,The Dawn, Thus Spoke Zarathustra, Beyond Good and Evil, The Antichrist, The Will to Power,  On the Genealogy of Morality এর মত অনন্যসাধারণ ভাবনার আকরগ্রন্থগুলির সম্যক আলোচনা এই পরিসরে অসম্ভব। তবে নীৎসে নামটি উচ্চারণ মাত্র যে ভাবনা এবং বিষয়গুলি মস্তিষ্কে আঘাত হানে, তার উপরই সামান্য আলোকপাত করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই বহুল চর্চিত এবং বহু বিতর্কিত দার্শনিকটি ভারতবর্ষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন। কিভাবে ? সুপ্রাচীন ভারতীয় আইন তথা নীতি শাস্ত্র মনুস্মৃতির উপর বিশদ আলোচনা রেখেছিলেন ফ্রিডরিক নীৎসে। The Anti-Christ শীর্ষক গ্রন্থটির ৫৭তম অধ্যায়ে উল্লিখিত এই জ্ঞানগর্ভ রিভিউটি নিয়ে বিশদ আলোচনার ইচ্ছে রাখি। মনুস্মৃতি সম্পর্কে এই মহান দার্শনিকটি কি মত পোষণ করতেন, নিম্নলিখিত উদ্ধৃতিটি পড়লেই পরিষ্কার হবে। 

"the sun shines on the whole book" মনুস্মৃতির প্রতিটি পাতায় সূর্যালোক। হ্যাঁ, ঠিক এই ভাষাতেই তিনি এই মহাগ্রন্থটির প্রশংসা করেন। এখানেই থেমে থাকেননি। সংযোজনটিও পড়ে নেওয়া যাক --"Close the Bible and open the Manu Smriti. It has an affirmation of life, a triumphing agreeable sensation in life and that to draw up a lawbook such as Manu means to permit oneself to get the upper hand, to become perfection, to be ambitious of the highest art of living."[ Koenraad Elst: Manu as a Weapon against Egalitarianism. Nietzsche and Hindu Political Philosophy] 

বাইবেল বন্ধ করে মনুস্মৃতি খুলে বসুন। এতে জীবনের ইতিবাচক দিক প্রতিফলিত হয়েছে, এতে আছে এক অনুকূল সংবেদন যা জয়ের অভিমুখে ধাবিত হয়। মনুস্মৃতির মত একটি আইনশাস্ত্র মানে নিজেকে উচ্চতর স্থানে অভিষিক্ত করা, ত্রুটিহীন পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যা উচ্চতম যাপনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। 
হা হা হা অবাক হচ্ছেন ? হ্যাঁ এই মনুস্মৃতিকেই মাননীয় বি আর আম্বেদকর ১৯২৫ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর আগুনে নিক্ষেপ করেন। আলবাত পোড়াবেন। ওঁরই তো পোড়ানোর কথা। কিন্তু নীৎসে পোড়ানোর ক্ষমতা ওঁর ছিলনা। কিন্তু নীৎসেও কি মনুস্মৃতিকে অন্ধের মত মেনে নিয়েছিলেন ? নিশ্চয় না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা রেখেছেন। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। 

নীৎসে বলতেই যে শব্দ বা প্রতীতিগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেগুলি হল—anti-democracy, anti-populism, anti mass culture, anti egalitarianism , anti-herd morality. অর্থাৎ চরম গণতন্ত্র বিদ্বেষী, জনমোহিনী পদক্ষেপ বিরোধী [যেমন বিনা পয়সার সাইকেল, দু টাকার চাল], গণ সংস্কৃতি বিরোধী, সাম্যবাদ বিরোধী এবং সর্বোপরি গোষ্ঠীকেন্দ্রীক নীতি বোধের বিরুদ্ধে। জনগণের বৃহৎ অংশ যে ধরণের কালচার বা মূল্যবোধে বিশ্বাস রাখে তাকে নস্যাৎ করেই তাঁর Übermensch [উবারমেঞ্চ] বা সুপারম্যান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। কে এই  Übermensch ? পরে আসছি। 

নীৎসে, মুসোলিনি এবং নেতাজীর মধ্যেও কি এই বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতিফলন দেখিনা। নিশ্চিতভাবেই দেখি।স্বাধীন ভারতের শাসনপ্রণালী হিসেবে নেতাজী স্বয়ং একনায়কতন্ত্রকেই বেছেছিলেন। নীৎসে কেন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে? তাঁর মতে গণতান্ত্রিক “সাম্য” প্রতিষ্ঠিত হলে মেধাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মেদের অভিষেক ঘটে। মুড়ি মুরকির এক দর বলে বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। গণতন্ত্র ঠিক তাই করে। এর সঙ্গে যদি এই দেশের নিম্ন মেধার সংরক্ষণ বিষয়টি যোগ করে দেওয়া যায়, তবে যে কী পরিণাম ঘটে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। নীৎসে  এই তথাকথিত সামাজিক এবং রাজনৈতিক সাম্যের বিরোধী ছিলেন। সামান্য নোবেল, অস্কারের মত পুরস্কার যখন গণভোট দিয়ে নির্বাচন করা হয়না, বিদগ্ধ, মননশীল বিচারককুলের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, সেখানে রাষ্ট্রের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নীতি, অভিমুখ অশিক্ষিত, অপদার্থ জনতা ঠিক করবে ?না, মেধার পূজারি ফ্রিডরিখ নীৎসে এটি মেনে নিতে পারেননি। জনগণের লেজুড়বৃত্তি করা মানে একটি মানবেতর লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হওয়া। একারণেই তিনি মনুস্মৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। জ্ঞানে গুণে মেধায় যারা উচ্চ আসনে বিরাজ করছেন তাঁদের হাতেই সমাজ তথা রাষ্ট্রের ভার থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়। এই দুই শ্রেণির মধ্যে তিনি তাঁর  Übermensch [উবারমেঞ্চ] বা সুপারম্যানে উত্তরণের অভিমুখ দেখেছিলেন। এভাবেই একটি মেধাভিত্তিক সমাজের শিলান্যাস সম্ভব। মেধাহীন মানুষেরও জীবন এবং জীবিকার পূর্ণ অধিকার আছে। তাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু ক্ষুধার্তের হাতে খাদ্য দেওয়া যেতে পারে, ক্ষমতা নয়। তার পরিণাম ভয়াবহ। কিন্তু গণতন্ত্রে এর উল্টোটাই হয়—ধরা যাক নেতাজী এবং পচা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য নির্বাচনে দাঁড়াল—জনতাকে বলা হল ভোট দাও। জনগণের বেশিরভাগই যেহেতু পচার দলে, অর্থাৎ পচার মত হাবভাব, চলন বলন শিক্ষা দীক্ষা তাই নেতাজীর বদলে পচারই জেতার বেশি সম্ভাবনা। আর এভাবেই চারদিকে পচা, মোতা, গোতা, সটাদের ক্ষমতায়ন। সাম্যবাদের কট্টর বিরোধী নীৎসে তাই মনুস্মৃতিকেই এগিয়ে রেখেছেন। তবে জন্মসূত্রে কাউকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র বলে দাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছেন। একমাত্র মাপকাঠি মেধা। নীৎসের Übermensch [উবারমেঞ্চ] বা সুপারম্যান যে কোনো শ্রেণি থেকেই উঠে আসতে পারেন। নিজেকে অতিক্রম করে মহত্তর, শ্রেষ্ঠতর অস্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। মনুস্মৃতির আগে রচিত বেদ উপনিষদ এমনকি গীতাতেও এই জন্ম নয়, কর্মের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠা বিশ্বামিত্র, ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষত্রিয় হয়ে ওঠা পরশুরাম, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শবরদের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক তথ্যই সেই দিক নির্দেশ করে। জন্মের উপর জোর না দিয়ে কর্মের উপর আলো ফেলা। আসুন, মনুস্মৃতি এবং মার্ক্সবাদী সাম্যকে পাশাপাশি রেখে তিনি  আর একটি অমূল্য পর্যবেক্ষণ রেখেছেন-- 

Whom do I hate most heartily among the rabbles of today? The rabble of Socialists, the apostles to the Chandala, who undermine the workingman’s instincts, his pleasure, his feeling of contentment with his petty existence—who make him envious and teach him revenge . . . . Wrong never lies in unequal rights; it lies in the assertion of “equal” rights . . . . What is bad? But I have already answered: all that proceeds from weakness, from envy, from revenge. [section no. 57 of Friedrich Nietzsche’s The Anti-Christ. The translation is by H. L. Mencken.] 

বর্তমানে যত ইতর মনুষ্য দেখি [তাদের মধ্যে সবচেয়ে] কাদের অন্তর দিয়ে ঘৃণা করি ? ঘৃণা করি সাম্যবাদীদের, ঘৃণা করি যারা চণ্ডালদের মাথায় তোলে—শ্রমজীবীদের সহজাত প্রবৃত্তিকে, তাদের পেশাগত আনন্দকে, নিজেদের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের মধ্যে খুঁজে পাওয়া তৃপ্তিকে নস্যাৎ করে দেয়—যারা এদের ভুল বুঝিয়ে ঈর্ষাপ্রবণ  করে তোলে, যারা এই চণ্ডালদের প্রতিশোধের পাঠ দেয়---- অসম অধিকারে কোনো অন্যায় নেই, “সাম্যের” শ্লোগান তোলাটাই অন্যায়। তবে মন্দ কাকে বলব ? ইতিমধ্যেই উত্তর দিয়েছি—যা দুর্বলতা থেকে, ঈর্ষা থেকে, প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে জাত। 

ভাত রুটির সাম্য, মেধাহীন মানুষকে সিংহাসনে বসানোর সাম্য, উৎকৃষ্ট মানবের অগ্রগতি রুদ্ধ করে নিকৃষ্টকে প্রথম সারিতে অধিষ্ঠিত করার সাম্য—না এসব নীৎসের জন্য নয়। তিনি একজন মনার্কিস্ট, অর্থাৎ রাজতন্ত্র/ একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাস রাখেন। তাঁর চোখ মহাকাশে। মানুষের সৃজনশীলতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে সোচ্চারে বলেছেন ব্যক্তিই তার সমাজ, সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক মূল্যবোধকে অতিক্রম করে নব নব অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়। জন্ম নেয় নতুন নীতি বোধ এবং নান্দনিকতা। প্রতিভাকে তার স্থান দিতেই হবে।  

Thus Spoke Zarathustra শীর্ষক গ্রন্থটিতে তিনি তাঁর Übermensch [উবারমেঞ্চ] বা সুপারম্যান/ ওভারম্যান সম্পর্কে কি বলেছেন ? কেমন হবে সে ? তাঁর গন্তব্যই বা কি ? কেনই বা তাঁকে কান্ডারির ভূমিকায় দেখতে চেয়েছেন ? একটি উদ্ধৃতি পড়ে নেওয়া যাক।  

 I teach you the overman. Man is something that shall be overcome. What have you done to overcome him?... All beings so far have created something beyond themselves; and do you want to be the ebb of this great flood, and even go back to the beasts rather than overcome man?  

আমি তোমাকে “অতিমানব” হতে বলি। মানবকে অতিক্রম করে যে পথটি অনন্তের দিকে বেঁকে গেছে, তুমি সেই পথের পথিক। বলো, মানুষকে পরাজিত করার মত তুমি কি কাজ করেছ? সমস্ত প্রাণিই তো তার চেয়ে উন্নততর কিছুর জন্ম দিয়েছে। তুমি কি মানুষ হয়েই থেমে যাবে ? আর এগোবেনা ? এই যে বিপুল জলরাশি তুমি কি সেখানে কেবল ভাঁটার রূপকার হবে ? তুমি কি অবশেষে সেই পশুদের কাছেই ফিরে গিয়ে পুনরায় পশু হয়ে যাবে ? তবু মানুষকে পরাজিত করে “অতিমানব হয়ে” উঠবে না ? 

কি বন্ধু সাদৃশ্য পাচ্ছেন ? আমি তো পাচ্ছি। কিঞ্চিৎ গভীরে গেলে আপনিও পাবেন। কেই এই Übermensch [উবারমেঞ্চ] বা সুপারম্যান/ ওভারম্যান? আপনার আমার অতি পরিচিত একটি প্রতীতি  --যা কয়েক সহস্র বছর আগে জন্ম নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল--- হ্যাঁ সেই মহান আর্য সভ্যতার আলো---উপনিষদের সেই অমল উচ্চারণ অমৃতস্য পুত্রাঃ ! আর্যপুত্র জরাথুস্ট্রকে কেন্দ্র করে নীৎসে যে আধুনিক ভাষ্যটি রচনা করেছেন, এই অমৃতস্য পুত্রাঃ-ই সেখানে Übermensch হয়ে নব রূপে ফিরে এসেছে। অমৃতস্য পুত্রাঃ থেকেই তো অবতারের জন্ম। এমন এক নায়ক যা নীৎসের ভাষায় "Caesar with the soul of Christ"! 
সিজারের অনুশাসন, খ্রিস্টের আত্মা ! 
স্ববিরোধী মনে হচ্ছে ? কেন বাংলাতেই তো শুনেছেন বজ্রের মত কঠিন, কিন্তু ফুলের মত নরম। হ্যাঁ, নেতাজী এমনই একজন ছিলেন। আপনাদের কি মনে হয় ? 
কেমন লাগল সেই চক্র ভ্রমণ ? নেতাজীকে জানতে হলে মুসোলিনিকে জানতে হয়, মুসোলিনিকে জানতে চাইলে নীৎসে, আবার নীৎসেকে বুঝতে চাইলে মনুস্মৃতি এবং উপনিষদ ! সেই আর্য উত্তরাধিকার !  

নীৎসের আবার জাগছেন। কেবল ভারতে নয়, সমগ্র ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে তাঁর ক্রম বর্ধমান ছায়া। দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র এবং তথাকথিত সাম্যবাদের আগাছা নির্মূল করতে এছাড়া উপায় নেই। নেতাজীকে মালা পরাতে চাইলে সবার আগে এই পূতিগন্ধময় গণতন্ত্রকে লাথি মারুন। তারপর করজোড়ে প্রার্থনা করুন। কি নামে ডাকবেন ? তাও বলে দিতে হবে ? নীৎসের Übermensch, অথবা উপনিষদের অমৃতস্য পুত্রাঃ !

--
অমৃতস্য পুত্রাঃ (প্রকাশিতব্য  দ্বিতীয় খণ্ড) থেকে। 

0/Post a Comment/Comments

যুক্তি সংগত কথা বলুন.................

Stay Conneted