সম্পদই যখন বিপদ / দেবাশিস লাহা
হরিণের শিঙ, নারীর মাতৃত্ব এবং বাঙালির উদারতা -- আপাতভাবে যতই ভিন্ন হোক, গভীরে গেলেই বুঝবেন এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে। উঁহু আমাকে উন্মাদ ঠাওরালে ব্যাপক পস্তাতে হবে, আগেই জানিয়ে রাখছি।
আসুন একটু ভাবা প্র্যাকটিস করি। হরিণ নামক তৃণভোজী চতুষ্পদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গর্বের বস্তুটি হল অপরূপ, শৈল্পিক এবং সুউচ্চ দুটি শিং! অরণ্য, জনপদে শিং ওয়ালা চতুষ্পদের অভাব নেই। গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ছাড়াও অনেক তৃণভোজী, গুল্মভোজী প্রাণিরই শিং আছে। কিন্তু হরিণের শিং! আহা তেমনটি আর কার আছে! যেমন রূপ, তেমন বাহার! সুদক্ষ ভাস্করের কুশলতায় প্রকৃতি তার শিংদুটিকে নির্মাণ করেছে৷ সবুজে সবুজ তৃণভূমির উপর দিয়ে যখন সে হেঁটে যায়, এই সুউচ্চ, দৃপ্ত শিংদুটিই তাকে রাজকীয় করে তোলে। হরিণ ভাবতেই প্রথমেই মনে আসে এই শিং! ব্যাপারটা এখানে মিটে গেলে এই আলোচনাটির সূত্রপাতই হতনা। তবে কেন এই পোস্ট? ভেরি সিম্পল!
ব্যাপারটা ওখানে মিটলনা বলেই! কেন মিটল না? কারণ পরম সৌন্দর্যের , চূড়ান্ত গর্বের, অপরূপ ভাস্কর্যের এই শিং দুটিই হরিণের মৃত্যুর কারণ ঘটায়। কীভাবে? হরিণকেই জিজ্ঞাসা করুন! যাহ তা আবার হয় নাকি! বেশ আমিই বলে দিচ্ছি। বাঘ, সিংহের মত মাংসাশী প্রাণি যখন আক্রমণ করে হরিণ কিন্তু অনায়াসে না হলেও কষ্টেসৃষ্টে পালিয়ে যেতেই পারে। কারণ তার গতিবেগ যথেষ্ট ভাল। কিন্তু সে তো ফাঁকা মাঠে। জঙ্গলে তেমন ফাঁকা জায়গা কোথায়? চারদিকেই তো গাছপালা, লতাপাতা! ব্যাস তাতেই বেচারার শিং আটকে যায়। আর সেই সুযোগে বাঘ বাবাজি সোজা পিঠের উপর! পরের গল্পটা নাই বা বললাম! যে শিংদুটি তার পরিচয়, গর্ব এবং বৈশিষ্ট্যের ধারক এবং বাহক তারাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে!
আর নারীর মাতৃত্ব! আহা তার মত পবিত্র, অপরূপ এবং ঐশ্বরিক কিছু হয় নাকি! পুরুষ যেখানে করুণভাবে ব্যর্থ সেখানেই নারীর এই চরম সার্থকতা। সে জন্ম দিতে পারে! তার দেহেই জরায়ু আছে,যেখানে তিল তিল করে প্রাণকণারা বড় হয়ে ওঠে। নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্র সে মা হয়ে ওঠে। অনাস্বাদিতপূর্ব এই অনুভব শিরা উপশিরায় অনুরনন তোলে! নারীর সবচেয়ে বড় পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, গর্ব, সৌন্দর্য তার মাতৃত্ব! জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা! ব্যাপারটা এখানেই মিটে গেলে এই পোস্টের দরকার পড়তনা। তবে কেন দরকার পড়ল? ভেরি সিম্পল!
ব্যাপারটা মিটলনা বলে! কারণ যে মাতৃত্ব তার পরম গর্বের, সৌন্দর্যের, প্রাপ্তির, সেই অপরূপ বৈশিষ্ট্যটিই তার বিপন্নতা ডেকে আনে। উৎপাদনশীল জমিকে যেমন দখলে রেখে ফসল ফলানোর কার্যক্রম চলে, তেমনই জন্মদাত্রী নারীকে দখলে রেখে মানুষের ফসল অর্থাৎ জনবল বাড়ানোর কার্যক্রম চলে। মৌলবাদীদের হাতে নারীরা পদদলিত, নিকৃষ্ট, এবং অসহায় এক পণ্যে রূপান্তরিত হয়। জন্ম দেওয়া ছাড়া তার যেন আর কোনো ভূমিকাই নেই। তবে কী দাঁড়াল? ওই যে হরিণের শিংয়ের মত! ( নারীর) যাহা অনন্য, তাহাই (বস্তুত) পণ্য!
বাঙালি! আহা শব্দটি শুনলেই কেমন একটি গর্ব হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি! বাঙালি মানেই উদারতা, বাঙালি মানেই মানবতা যা ধর্মীয় সংকীর্ণতা, ভেদাভেদের পূতিগন্ধময় সীমানা অতিক্রম করে তাকে এক মহান, পবিত্র উচ্চতায় স্থাপিত করে৷ আহা! এদেশে নবজাগরণের বাতাস তো বাঙালিই এনেছিল! তাই এদেশের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় জ্ঞানে, বিজ্ঞানে,সংস্কৃতিতে বাঙালি অনেক অনেক এগিয়ে! দেশের প্রায় সব কটা নোবেলই তো --- কী বললেন? গোবলয়! আরে ছোঃ ওদের আবার কালচার আছে নাকি! গোবর আর গোমূত্র নিয়ে পড়ে আছে! ঠিক! ঠিক! কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই মিটে গেলে এই আলোচনাটির প্রয়োজনই পড়তনা। প্রয়োজন কেন পড়ল? ভেরি সিম্পল! ব্যাপারটা ওখানেই মিটলনা বলে! কারণ এই শিক্ষা উদারতা, মানবতা যা বাঙালির সবচেয়ে সুন্দর,পবিত্র, মহান পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য সেটিই অতীতে তার ধ্বংসের কারণ হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে। কীভাবে? বাঙালিকেই জিজ্ঞাসা করুন! বেশ, আপাতত আমিই বলে দিচ্ছি! নবজাগরণ সঞ্চারিত প্রজ্ঞা, সেকুলারিজম সিঞ্চিত ধর্মনিরপেক্ষতা, হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই উচ্চারিত উদারতাই তার ভিটেমাটি দ্বিখণ্ডিত করেছে। পরবর্তী খণ্ডটির আয়োজনও ইতিমধ্যে সেরে ফেলা হয়েছে। কখন,কেন, কিভাবে সেই বিশদ আলোচনায় নাই বা গেলাম। এনিয়ে অসংখ্য পোস্ট, আলোচনা, লেখালেখি হয়েছে। ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। তবে কী দাঁড়াল? কেন ওই যে হরিণের শিংয়ের মত!
হরিণের শিং, নারীর মাতৃত্ব, বাঙালির উদারতা -- এই তিনটি বিষয়কে আমি অভিন্ন দৃষ্টিতেই দেখি। কারণ এরা আমাকে Achilles' heel নামক ইংরেজি ইডিয়মটির অস্তিত্ব মনে করিয়ে দেয়। কেন? এই বাগবিধি বা বাগধারাটির অর্থ হল weakness or vulnerable point অর্থাৎ এমন একটি দুর্বল স্থান, দিক বা অবস্থা যেখানে আঘাত করলে আহত ব্যক্তির পরাজয় বা মৃত্যু অবধারিত। অপরাজেয় গ্রীক বীর একিলিসের একমাত্র দুর্বল জায়গা তাঁর গোড়ালিটি! দেহের বাকি অংশে যতই আঘাত করা হোক, তাঁকে পরাজিত করা অসম্ভব ছিল! কেন? এবিষয়ে গ্রিক পুরানে একটি চিত্তাকর্ষক গল্প আছে। কী সেই কাহিনি? একিলিসের মা থেটিস চেয়েছিলেন তাঁর পুত্রটি নিখুঁত এবং পরম শক্তিশালী হোক। যাতে কেউ তার ক্ষতি করতে না পারে৷ সেই উদ্দেশ্যেই তিনি সদ্যজাত একিলিসকে স্টিক্স নদীর জলে চুবিয়েছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই নদীর জলে অলৌকিক ক্ষমতা। তার ফলেই একিলিস মহাশক্তিশালী, অপরাজেয় হিসেবে সুখ্যাত হন। কেবল মহাবীর হেক্টর নন, ট্রয়ের যুদ্ধে অসংখ্য যোদ্ধাকে তিনি পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তবু তাঁর মত মহাবীরও কেন ট্রয়ের যুবরাজ প্যারিসের হাতে নিহত হলেন? ওই যে গোড়ালি! হ্যাঁ প্যারিসের ছোঁড়া তিরটি একিলিসের গোড়ালি লক্ষ্য করেই ছুটে গিয়েছিল! ( যদিও মহা চালবাজ দেবতা এপোলোই তিরটিকে গোড়ালির দিকে বাঁকিয়ে দেন। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।) কী বললেন? সারা দেহ অভেদ্য হলেও একিলিসের গোড়ালিটা কেন দুর্বল হল? সত্যি! বাহবা না দিয়ে পারা যায়না। বলিহারি আপনাদের জ্ঞানতৃষ্ণা! ওই যে বললাম একিলিসকে স্টিক্স নদীর জলে চোবান দেওয়া হয়। মা থিটিস এই কাজটি করেন৷ সেই সময় তিনি একিলিসের গোড়ালিটি ধরে ছিলেন। তাই ওই অংশে অলৌকিক জলের স্পর্শটি লাগেনি। তাই অন্যান্য মানুষের মত দুর্বলই রয়ে গেল!
বুঝলেন তো! হরিণের শিং, নারীর মাতৃত্ব, বাঙালির উদারতা এসবই হল একিলিস হিল! অর্থাৎ এমন এক দুর্বলা জায়গা যা তাদের পরাজয়, মৃত্যু বা ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফারাক একটিই এগুলো আবার একই সঙ্গে গর্বের, সৌন্দর্যের, প্রাপ্তির জায়গা!
তবে উপায়!
শিং ছাড়া হরিণ হরিণ থাকবেনা, মাতৃত্ব বাদ দিয়ে সমস্ত নারীকে ভাবা মানে ধ্বংস ( শুধু নারী কেন সমগ্র সম্প্রদায়টিই বিলুপ্ত হবে), উদারতা ছাড়া বাঙালিও বাঙালি থাকবে কি?
কী গেরো বলুন তো!
Post a Comment
যুক্তি সংগত কথা বলুন.................