আমার ভারত, বিশ্বের গর্ব। আশা করি পড়বেন, খুব বড় নয়। একজন সুপন্ডিত সাহিত্যিক, দার্শনিকের বাস্তব অনুভব। শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদ।
----------------------------------------------------------------
"প্রাচীন বিশ্বে ভাষাতত্ত্বের বিকাশ ঘটেছিল ভারতবর্ষে : ভাষার সমস্ত দিকে ও স্তরে পড়েছিলো প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি । ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, অর্থের কোনোটিই তাঁদের দৃষ্টি ও মেধাকে এড়াতে পারে নি, ফলে ক্রাইস্টের জন্মের অনেক আগে ভারতবর্ষে গ'ড়ে উঠেছিলো এমন এক বর্ণনামূলক ভাষাশাস্ত্র, যাকে বিজ্ঞানসন্মত ব'লে মেনে নিতে সাংগঠনিকেরাও দ্বিধা করেন নি । ভারতবর্ষে স্বায়ত্তশাসিত শাস্ত্ররূপে ভাষাতত্ত্ব উদ্ভূত হয় নি : ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব ধর্মজ : ষড় -বেদাঙ্গরূপে জন্মলাভ করে ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব । বেদের ষড়াঙ্গ - 'শিক্ষা', 'কল্প', 'ব্যাকরণ', 'নিরুক্ত', 'ছন্দ', ও 'জ্যোতিষ' - এর মাঝে চারটিই ভাষাতাত্ত্বিক । বেদের শুদ্ধ পাঠ ও প্রয়োগের জন্যে যে-চারটি বেদাঙ্গ অত্যাবশ্যক , সেগুলো হচ্ছে - শিক্ষা , ব্যাকরণ, নিরুক্ত ও ছন্দ । এগুলো বেদসহায়ক শাস্ত্র । শিক্ষার কাজ বেদের শুদ্ধ উচ্চারণ নির্দেশ, ব্যাকরণের কাজ বেদের শুদ্ধ শব্দবিশ্লেষণ, নিরুক্তর কাজ বেদের শুদ্ধ অর্থনির্ণয়, ও ছন্দের কাজ বেদের শুদ্ধ ছন্দনির্দেশ । বেদের শুদ্ধতা রক্ষার জন্যে গ'ড়ে উঠেছিলো ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব , এবং ধার্মিকের ভক্তি ও ভাষাবিজ্ঞানীর দৃষ্টি নিয়ে গবেষণারত হয়েছিলেন প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিকেরা । বেদের শুদ্ধতা রক্ষা তাঁদের লক্ষ্য হ'লেও তাঁরা পুরোহিত-ধর্মযাজক ছিলেন না, তাই তাঁরা সহজেই অতিক্রম ক'রে যেতে পেরেছিলেন তাঁদের সংকীর্ণ উদ্দেশ্য । ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের উদ্ভবের সাথে কিছুটা সাদৃশ্য আছে আলেকজান্দ্রিয়ায় ভাষাতত্ত্বের উন্মেষের : সেখানে ধ্রুপদী সাহিত্যের শুদ্ধতা রক্ষার জন্যে জন্মেছিলো ভাষাতত্ত্ব ( দ্র @ ৭.১.৭ ) । ধ্রুপদী সাহিত্যের ভাষা যখন আলেকজান্দ্রীয় ভাষাবিদদের কাছে অত্যন্ত সুদূর ও শুদ্ধ অতীতের বিষয় হয়ে পড়েছিলো, চারপাশের ভ্রষ্ট ভাষার সাথে তার যখন মিল পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন বিশুদ্ধ অতীতের 'শুদ্ধ' ভাষা উদ্ধারের ও রক্ষার ।ভারতবর্ষে বৈদিক পুণ্যশ্লোকের ভাষা যখন সদূর পুণ্যলোকের অচেনা ভাষায় পরিণত, চারপাশে যখন শোনা যাচ্ছিলো না বেদের ঐশী ধ্বনিঝংকার, যখন কানে আসছিলো শুধু অশ্লীল কোলাহল, তখন বেদের শুদ্ধতা রক্ষার জন্যে জন্মে ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব ।
ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব এক প্রাণবন্ত শাস্ত্র : অসংখ্য ভাষাবিদ ও অজস্র ব্যাকরণগ্রন্থের ও ধারার এক মহিমামন্ডিত এলাকা ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব । এ-এলাকায় আছেন তিন শো-র অধিক ব্যাকরণবিদ, জন্মেছিলো বারোটির মতো ব্যাকরণধারা, এবং রচিত হয়েছিলো সহস্রাধিক ব্যাকরণগ্রন্থ [ দ্র বেলভালকার ( ১৯১৫ ) ] । ৮ ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব প্রবণতায় আনুশাসনিক, কিন্তু প্রণালিপদ্ধতিপ্রকৃতিতে বর্ণনামূলক, এবং অনেকাংশে রূপান্তরমূলক । এ-শাস্ত্র চেয়েছে বেদের শুদ্ধতারক্ষার সূত্র বা বিধি রচনা করতে, তাই তা আনুশাসনিক ; কিন্তু যে-প্রণালীতে সে-সূত্ররাশি রচিত, তা বর্ণনামূলক, এবং মাঝে মাঝে এমনভাবে সূত্র রচনা করা হয়েছে, যার সাথে মিল পাওয়া যায় শুধু ১৯৫৭ উত্তর রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণের । তাঁরা অবশ্য সচেতনভাবে ভাষা 'সৃষ্টি' করতে চাননি, তাঁরা চেয়েছিলেন ভাষা বিশ্লেষণ করতে , নতুন নতুন শব্দ বা বাক্য সৃষ্টির জন্যে তাঁরা রচনা করেননি তাঁদের সূত্র, গঠিত শব্দের অনুপুঙ্খ বর্ণনা ছিলো তাঁদের লক্ষ্য ।
....ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ধারাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় : পাণিনি-পূর্ব ও পাণিনি-উত্তর । পাণিনিই সে-আলোকস্তম্ভ, যাঁর মধ্যে সঞ্চিত হয়েছিলো অতীতের সমস্ত আলোক, এবং যাঁর আলোতে আলোকিত হয়েছে সুদীর্ঘ উত্তরকাল । পাণিনি-পূর্ব ভাষাতাত্ত্বিকদের কয়েকজন :
যাস্ক, শাকল্য, শাকটায়ন, গার্গ্য, গালব, স্ফোটায়ন । সংস্কৃত ব্যাকরণের অধিকাংশ মূলতত্ত্ব প্রাকপাণিনীয় : বাক্যের অন্তর্গত পদসমুহকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছিলো তাঁর অনেক আগে । যাস্ক চার রকম পদ নির্দেশ করেছিলেন - বিশেষ্য, ক্রিয়া, উপসর্গ ও নিপাত ( অব্যয় ) । শাকটায়ন সিদ্ধান্তে পৌঁচেছিলেন যে ভাষার সমস্ত শব্দই ধাতুরাজ । শব্দকে প্রকৃতি ও প্রত্যয়ে, এবং প্রকৃতিকে পুনরায় নাম ও ধাতুতে বিভাগের প্রণালি স্থির হয়েছিলো পাণিনির বহু আগে । বাক্যের উদ্দেশ্য-বিধেয় বিভাগও প্রাকপাণিনীয় । বর্তমানে প্রচলিত ব্যাকরণিক পরিভাষার অধিকাংশ অপাণিনীয় ।
যাস্কের ( ? খ্রি পূ ৮০০-৭০০ ) গ্রন্থের নাম 'নিরুক্ত' । তিনি সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রাচীনতম 'নৈরুক্ত' বা ব্যুৎপত্তিতাত্ত্বিক । যাস্ক, 'নিরুক্ত'র পাঁচ অধ্যায়ে, নির্দেশ করেছেন বেদের শব্দরাশির ব্যুৎপত্তি ও গঠনপ্রণালি । যাস্কের পরেই যাঁর নাম আসে, তিনি বিশ্ববিশ্রুত পাণিনি, যাঁর মধ্যে প্রাচীনতম ভাষাতাত্ত্বিক ধারাগুলো পরিণতি লাভ করে । পাণিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপতাত্ত্বিক ; তাঁর 'অস্টাধ্যায়ী' ব্লুমফিল্ডের ( ১৯৩৩ ) মতে, 'মানবমনীষার পরম উৎকর্ষের নিদর্শন' । তিনি শুধু শ্রেষ্ঠ রূপতাত্ত্বিক নন, সর্বাধিক ভাগ্যবানও ; - 'অষ্টাধ্যায়ী'ই হচ্ছে প্রাচীনতম শব্দশাস্ত্রগ্রন্থ , যা অখন্ডরূপে উত্তরকালের হাতে এসে পৌঁচেছে। বলা যায় পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী'ই হচ্ছে সংস্কৃত ভাষাতত্ত্ব জগতের একমাত্র অখন্ড মৌলিক গ্রন্থ : এর পূর্ববর্তী রচনারাজি কালের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে ভগ্নাংশরূপে উপস্থিত হয়েছে উত্তরকালের নিকট , আর 'অষ্টাধ্যায়ী'-উত্তর ব্যাকরণ পুস্তকগুলো 'অষ্টাধ্যায়ী'রই ভাষ্য-উপভাষ্য-মহাভাষ্য । প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতত্ত্বমনীষা জড়ো হয়েছিলো একটি গ্রন্থে - 'অষ্টাধ্যায়ী'তে ; এর পূর্ববর্তী ভাষাতাত্ত্বিক গ্রন্থরাজি প্রায় বিস্মৃত বিলুপ্ত ; এবং এর পরবর্তী গ্রন্থগুলো জন্মেছে এরই গর্ভ থেকে, বা একে কেন্দ্র ক'রে । প্রথানুবর্তনে ভারতীয় প্রতিভা তুলনারহিত । প্রতিষ্ঠিত ধারার অনুকরণ এবং অনুকরণ ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের একটি বড়ো লক্ষণ । ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে চারজনই প্রধান পুরুষ : পাণিনি, কাত্যায়ন, পতঞ্জলি ও ভর্তৃহরি । প্রথম তিনজন ঋষির মর্যাদা পেয়েছেন ; - তাঁদের সম্মিলিত রচনারাশির অভিধা 'ত্রিমুণি ব্যাকরণ' । ভর্তৃহরির ভাগ্যে অবশ্য ঋষির সন্মান জোটেনি যদিও তাঁর মেধা ও তত্ত্ব অত্যুজ্জ্বল ।
পাণিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাচীন ভারতের সালাতুর -এ ( লাহোর ), সম্ভবত খ্রিপূ চতুর্থ শতকে । তাঁর 'অষ্টাধ্যায়ী' আট অধ্যায়ে বিন্যস্ত চার হাজার সূত্রের সমষ্টি । এ-সূত্ররাশি সমস্ত সংস্কৃত শব্দের গঠনপ্রণালি নির্দেশ করেছে । তাঁর পরে আসেন তাঁর শত্রুমিত্ররা : ভাষ্য-উপভাষ্যকারগণ । পাণিনির প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী ও ত্রুটিনির্দেশক কাত্যায়ন । [ ?খ্রিপূ দ্বিতীয় শতক ] । কাত্যায়ন তাঁর 'বার্তিকা'য় পাণিনির অনেক সূত্রের ত্রুটি নির্দেশ করেছেন, এবং নতুন সূত্র রচনা করেছেন ; এবং অনেক সূত্র সংস্কার ক'রে দিতে চেয়েছেন শুদ্ধ রূপ । চার হাজার বার্তিকায় তিনি ত্রুটি ধরেছেন পাণিনির পনেরো শো সূত্রের, এবং সে-সব সূত্র সংশোধন করেছেন । শত্রুর পরে আসেন মহামিত্র পতঞ্জলি [ খ্রিপূ দ্বিতীয় শতক ] : তিনি খন্ডন করতে চেষ্টা করেন পাণিনির বিরুদ্ধে কাত্যায়নের অভিযোগগুলো । তিনি 'অষ্টাধ্যায়ী'র যে-ভাষ্য রচনা করেন, তার নাম 'মহাভাষ্য'। 'মহাভাষ্য'ও আট-অধ্যায়ী, এবং প্রতিটি অধ্যায়ে আছে চারটি ক'রে পদ, এবং প্রতিটি পদ বিভক্ত এক থেকে ন-টি আহ্নিকে । তিনি পাণিনির সমস্ত সূত্রের ভাষ্য রচনা করেননি ; - কাত্যায়ন যে- সমস্ত সূত্রের ত্রুটি ধরেছেন, এবং তিনি নিজে যে-সমস্ত সূত্রকে সংশোধনযোগ্য ব'লে বিবেচনা করেছেন, শুধু সে-সমস্ত সূত্রের ভাষ্য রচনা করেছেন পতঞ্জলি । তাঁর পরবর্তী মহৎ ব্যাকরণবিদ ভর্তৃহরি [ সপ্তম শতক ] । তাঁর গ্রন্থ 'বাক্যপদীয়' ব্যাকরণতত্ত্ব সম্পর্কে ছন্দোবদ্ধ রচনা । তাঁকে বলা যায় 'পরমাণুবাদী' বা 'অদ্বৈতবাদী' ; আবিভাজ্যতা তাঁর তত্ত্বের সার কথা । তিনি 'বাক্যবাদী' ; তাঁর মতে বাক্য অখন্ডনীয় অবিভাজ্য । 'বাক্যপদীয়' বিভক্ত তিন অধ্যায়ে : ব্রহ্ম বা আগমকান্ড, বাক্যকান্ড, এবং পদ বা প্রকীর্ণকান্ড । তাঁর পর ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিকদের নতুন কিছু করার ছিল না । ইতিমধ্যে সংস্কৃত ভাষা সুচারুরূপে ম'রে গেছে, চারপাশের অপভ্রংশের অশ্লীল কোলাহলও তাকে আর অশুদ্ধ করতে পারছিলো না । সংস্কৃত তখন পরিণত হয়েছে এক শ্রদ্ধেয় অবিচল নিষ্প্রাণ ধ্রুপদী ভাষায়, জীবনের তীব্র তাপেও বিপর্যস্ত হ'তে পারছিলো না তার কোনো ঠান্ডা সূত্র । তাই ভাষাতাত্ত্বিকেরাও মুক্তি পেয়েছিলেন মেধা নিয়োগ ক'রে নতুন সূত্র রচনার দায় থেকে । তাঁদের সামনে তখন শুধু খোলা থাকে একটি রাস্তা : মহামুনি পাণিনির জটিল কঠিন নির্মম 'ভাষাবিজ্ঞানীর ব্যাকরণ' অষ্টাধ্যায়ী'র সরলীতরলীকরণ হয় শুধু তাঁদের কৃত্য । সরলীতরলীকরণ ধারার প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বিমলসরস্বতীর [ চতুর্দশ শতক ] 'রূপমালা' । এ-গ্রন্থের অনুকরণে জন্মে 'কৌমুদী' নামের সরলীকৃত ব্যাকরণের এক দীর্ঘ ধারা । কৌমুদীজাতীয় পাণিনির সরল ভাষ্যকারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভট্টোজি দীক্ষিত [ সপ্তদশ শতক ] । 'সিদ্ধান্তকৌমুদী' নামে তিনি রচনা করেন পাণিনির এক সরল ভাষ্য, আর এ-ভাষ্য এতো প্রিয় ও প্রতাপশালী হয়ে উঠেছিলো যে 'অষ্টাধ্যায়ী' শিক্ষাক্ষেত্র থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়েছিলো । স্বরচিত সিদ্ধান্তকৌমুদীর ভাষ্যও তিনি রচনা করেছিলেন 'প্রৌঢ়-মনোরমা' ও 'বাল-মনোরমা' নামে । এছাড়া বহু ভাষ্য রচিত হয়েছিলো পাণিনির 'ধাতুপাঠ', 'গণপাঠ', 'লিঙ্গানুশাসন', 'উনাদিপাঠ', এবং
'পরিভাষা'র ।"
______________________________________
৭.৫ - ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব । সপ্তম পরিচ্ছেদ ।
বাক্যতত্ত্ব ।
হুমায়ুন আজাদ
রিপোষ্ট করলাম।
Post a Comment
যুক্তি সংগত কথা বলুন.................