ধর্মের লাইফ সাপোর্ট সমাজের কোন শ্রেণী থেকে আসে।

হুমায়ূন আহমেদের শেষদিকের লেখালেখি একটা বিপদজনক খাদের দিকে যেতে দেখে আমি শংকিত ছিলাম। কে জানে বেঁচে থাকলে এতদিনে তিনি হয়ত 'হিমু ওমরাহ যাবে' টাইপের কিছু একটা লিখেও ফেলতেন!

প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় তিনি একবার লিখলেন, মঙ্গল গ্রহে একটা ক্যামেরা পাওয়া গেলে আপনি নিশ্চয় প্রশ্ন তুলবেন এই ক্যামেরার একজন কারিগর আছে। আমাদের এই বিশ্বেরও তেমনি একজন কারিগর আছে ...। একদম শেষ দিকে হুমায়ূন আহমেদ হযরত মুহাম্মাদকে নিয়ে উপন্যাস লেখা শুরু করে শেষ করতে পারেননি। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের নিকটাত্মীয়। তার অনুরোধ হুমায়ূন আহমেদ এই উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলেন।

এত কথা কেন বলছি, আমরা শুধু উন্মত্ত তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের মারামারি দেখে, গজারী হাতে মাদ্রাসার ছাত্রদের জঙ্গি মিছিল দেখে, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার জানাজায় লক্ষাধিক টুপি দাড়িঅলা হুজুর দেখে এদের কাঠমোল্লা অশিক্ষিত ইত্যাদি বলে যে একটা বিশেষ কিছুর অস্তিত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছি সেকথা জোরেশোরে বলা উচিত। মাদ্রাসার ছাত্ররা মহাবিশ্বের "ঘড়িতত্ত্ব" জানে না। এসব ইংরেজি বই পড়ে হুমায়ূন আহমেদের লেবেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাস আধুনিকতায় মোড়ানো আর্গুমেন্টে যা আসলে লজিক্যাল ফ্যালাসির শঠতায় বিদ্ধ। এরা আপনাকে বলবে নিউটনও ধর্ম বিশ্বাস করত। কিন্তু নিউটন ধর্ম বিশ্বাস করেও ইসলাম মতে নাস্তিকদের মত কঠিন শাস্তি পাবে! কারণ নিউটন ইসলাম গ্রহণ করেননি! তিনি মুহাম্মনকে নবী মানেননি। এরকম অযৌক্তিক স্থূল বিশ্বাস এইসব শিক্ষিত লেখাপড়া জানা লোককেও বিশ্বাস করতে হবে যদি সে প্রচলিত ধর্মগুলোর পক্ষ নিয়ে থাকে। তথাকথিত কাঠমোল্লার মতই তাকে মেনে নিতে হবে মাছির এক ডানায় জীবাণু অন্য ডানায় ঔষধ থাকে তাই খাবারে মাছি বসলে তাকে ডুবিতে দিতে হবে পাত্রের মধ্যে! এগুলো মেনে নিতে হবে কেননা এগুলো মুহাম্মদের বাণী। এই জিনিসগুলো কিন্তু তাদের "ইসলাম ও বিজ্ঞানের" আলোচনায় আসে না!

অথচ এই লেবেলের ধর্মবাদী শিক্ষিত লোকগুলো ধর্মের পক্ষে নেয়াটা ধর্মবেত্তাদের জন্য বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে। আমাদের মত নিয়তিবাদী কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজের জনমানুষের বৈজ্ঞানিক যুক্তিমনষ্কতার বদলে তাদের অন্ধবিশ্বাসকে আরো শক্তিশালী করে তোলে যখন এরা ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান অচল বলে আইনস্টাইনের ঘাড়ে এই কথার দায় চাপান। আদৌ আইনস্টাইন যে এমন কথা কখনোই বলেননি সেকথা সাধারণ ধার্মিকরা কি আর যাচাই করে দেখবে?  যদি শোনে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বলছেন তাতেই সেকথার পক্ষে যথেষ্ট। আর তা যখন তাদের বিশ্বাসের পক্ষে যাচ্ছে!   একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। উইলিয়াম প্যালি নামের একজন দার্শনিক যুক্তি দিয়েছিলেন,  "একটি ঘড়ির যেমন কারিগর লাগে, তেমনি মহাবিশ্ব তৈরির পেছনেও একজন কারিগর আছে"। হুমায়ূন আহমেদের মঙ্গল গ্রহের ক্যামেরার কারিগর থিউরি এই প্যালি থেকে ধার করা। মহাবিশ্বের সৃষ্টিতে ঈশ্বরের ভূমিকা কি ছিলো এরকম প্রশ্নে চার্চের জবাব ছিলো আমতা আমতা উত্তরহীন।  উইলিয়াম প্যালির ঘড়ি থিউরির পর চার্চ জোরেশোরে ঘড়ি থিউরি তাদের খ্রিস্টান বিশ্বাসীদের মাঝে প্রচার করতে লাগল। একজন দার্শনিকের বক্তব্য কোট করে ধার্মীকদের বুঝানো গেলো "বিজ্ঞানীরাই বলেছেন বিশ্বজগতের একজন কারিগর আছে "!

হালের "ইসলাম ও বিজ্ঞান" নামের হাঁসজারু আসলে পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রচারনাগুলোর ইসলামিক ভার্স মাত্র।  জাকির নায়েক পশ্চিমের বহু লজিক্যাল ফ্যালাসি নিজের বক্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ ধার্মিক মানুষ এতসব খবর রাখে না। তারা কোন ডাক্তার সাহিত্যিক জ্ঞানী বুদ্ধিজীবীর মুখে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে "বৈজ্ঞানিক" প্রমাণ শুনে স্রেফ ঈমান আনে। এ কারণে তারা জানে না উইলিয়াম প্যালির থিউরি শোচনীয়ভাবে আধুনিক বিজ্ঞান তার তথ্য প্রমাণ দিয়েই বাতিল হয়েছে। বিজ্ঞানের চাক্ষুষ প্রমাণ দর্শনের মৃত্যু ঘটিয়েছে।

এই লেখাটি লিখতাম না যদি না সকালবেলা মোবাইল খুলেই একটা লেখা চোখে না পড়ত। শুরুতে হুমায়ূন আহমেদের মত শ্রেণীর যে উদাহরণ দিলাম সেকারণেই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক  মো. মিজানুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনে যে লেখাটি লিখেছেন তা এই সময়ে যখন একশ্রেণির আলেম তাদের ইসলামিক বিশ্বাস থেকে ভাইরাসকে অস্বীকার করে বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য বিধিকে চ্যালেঞ্জ করছে, যখন সারা দুনিয়া বিজ্ঞানাগারে দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভ্যাকসিনের আশায়, যখন ধর্মগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা শুরু করেছে তখন। ধর্মকে বাঁচাতে  যে শ্রেণীটা এগিয়ে আসছে তারা কারা তা এসময়ে স্পষ্ট হবে। তারাই যে বিজ্ঞানমনষ্ক সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা তা আবার প্রমাণ হবে।  নৃবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক লিখছেন, "আমরা দেখতে পাই ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান। মহামারির বর্তমান এই অনিশ্চয়তার সময়েও “ধর্ম বনাম বিজ্ঞান” নয় বরং “ধর্ম ও বিজ্ঞান” এই নীতি বেশি কার্যকর হবে বলে আমি মনে করি।"

ভদ্রলোক তার লেখায় পাকিস্তানের তালেবানকে "তথাকথিত " বলেছেন! তারমানে তালেবান বলতে জঙ্গি কিছু তিনি মানেন না?  করোনা প্রচারণা ইসলামকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে পরামর্শ দিয়ে লিখেছে, "কল্পনা করুন বাংলাদেশেও যদি ধর্মীয় নেতা বা ইমামগণ কর্তৃক কলেমা বা অন্য কোনো দোয়া পড়তে পড়তে বিশ সেকেন্ড হাত ধোয়ার পরামর্শ আসত তবে এর প্রভাব কী হতে পারতো"।

ধর্মের লাইফ সাপোর্ট সমাজের কোন শ্রেণী থেকে আসে দেখা গেলো। আমরা খালি হুজুরদের গজারী নিয়ে দৌড়ঝাঁপটাই দেখি। তাদের টিকে থাকার জন্য এইসব শিক্ষিত শ্রেণীর দৌড়ঝাঁপ দেখি না। হুজুরদের দৌড়ঝাঁপ দেখে আবার এই শ্রেণীর কেউ কেউ নির্জন দ্বীপে গিয়ে একা বাস করতে চান!  একবার ভেবেও দেখেন না বৈজ্ঞানিক যুক্তিমনস্ক প্রজন্ম সৃষ্ট করতে কি করেছেন?

0/Post a Comment/Comments

যুক্তি সংগত কথা বলুন.................

Stay Conneted