প্রগতির নাভীমূল ছিঁড়ে যাওয়া এক দুঃখী জেলার নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া!

প্রগতির নাভীমূল ছিঁড়ে যাওয়া এক দুঃখী জেলার নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া! 
  
অথচ এই জেলাটিই বাংলাদেশের অনুকরনীয় ও অনুস্বরনীয় জেলা হবার কথা ছিল। যেটা সংস্কৃতি চর্চা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চর্চার উভয় ক্ষেত্রেই হতে পারতো। কিন্ত তা না হয়ে হয়ে উঠেছে সকলের ঘৃণা ও ধিক্কারের জেলা। সারা দেশের মানুষ এখানকার অধিবাসীদের নিয়ে হাসি-তাচ্ছিল্য করছে। এখানে হিংস্র মৌলবাদের সূতিকাগার হিসেবে কী করে জন্ম ও প্রসার ঘটেছে সে ইতিহাস অন্য আলোচনার। নেট ঘাটছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে। বার বার অবাক হতে হয় বিষ্ময়ভরা চোখে। কী নাই তাদের ইতিহাস ঐতিয্যে! ভাবছি আর ভাবছি এই স্বর্ণালী ভূখন্ডের ট্র্যাজেডি নিয়ে। কেন এমন হলো! এমন তালিবান চেতনা বিকাশ কাদের হাত ধরে হলো। এই সর্বনাশ হবার পূর্ব লক্ষণ কি কেউ টের পায় নি। একবারে তো হয়নি, ধীরে ধীরেই এটা হয়েছে। রাজনৈতিক সমর্থন তো আগেও ছিলো এখনো আছেই। কেউ প্রত্যক্ষভাবে করেছে, কেউ পরোক্ষভাবে।

এবার 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া' বিষয়ে আসি। ঈসা খাঁ বাংলায় প্রথম এবং অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেন সরাইলে। সেটাও ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা দেওয়ানী লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ত্রিপুরাকে দুইটি অংশে বিভক্ত করে যখন মুঘল আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মসলিন কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা লিখলে এই জেলার নাম সবার অগ্রভাগে চলে আসবে। উভয় আন্দোলনে কতো বীর সেনানী, কতো বিপ্লবী এ ভূখন্ডে খেকে ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন। আমাদের অন্য ৬৩ জেলার মানুষদের এখানকার ইতিহাস না পড়লেও চলে। কিন্ত কষ্ট হয় নিজ জেলার ইতিহাস পড়া ও চর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষেরাই। তারা নিজ ভূখন্ডের সৃষ্ট ইতিহাসের ওপর দাঁড়াতে পারে নি। তাদের ইতিহাস, তাদের পরিচয়, তাদের গর্ব, তাদের শেকড়, তাদের ঐতিহ্য, সুনাম-কোনোটাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চর্চা হয় নি। হলে এখানে মৌলবাদ কখনো এভাবে জায়গা করে নিতে পারতো না। এখানে যে একটা মতাদর্শের বীজবপনে ধর্মের রাজনীতি তলে তলে আগায় নিয়েছে সেটা প্রশাসন বা সরকার দু পক্ষই আমলে নেননি। ভেবেছে, এক জেলা দিয়ে কী আর করতে পারবে ওরা!  আজকের এই লকডাউন ভাঙার জানাজা শুধু সাধারণ একটি জানাজা ভাবলে ভুল করব আমরা, এটা পরিষ্কার রাজনৈতিক সামাবেশ বা শোডাউনও বলতে পারেন।

এই দেশের মানুষ অবাক না হয়ে বরং আনন্দিত হতো যদি আজকের বেঙ্গল গ্রুপ যে আন্তর্জাতিক ক্লাসিক্যাল উৎসবের  আয়োজন করে থাকে সেটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষরা আয়েজন করতো। তাদের সেই শক্তি সামর্থ ও আয়োজনের যৌক্তিক পরিচয় ছিলো। কেননা, বিশ্ব বরেণ্য সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এই মাটির সন্তান। শুধু তাই নয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের সঙ্গীতজ্ঞ আলী আকবর খান,  ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, সঙ্গীত তাপসী অন্নপূর্ণার মতো আরো অনেক সঙ্গীত সাধকের জন্ম এ মাটিতেই। এছাড়াও ভাষা সৈনিক এবং রাজনীতিবিদ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী উল্লাস কর, সুনীতি চৌধুরী, অখিলচন্দ্র নন্দী, শান্তি ঘোষ ও অতীন্দ্রমোহন রায় এখানেই জন্মগ্রহণ করেছেন। ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে সুনীতি চৌধুরী, শান্তি ঘোষ ও গোপাল দেব প্রকাশ্য দিবালোকে তদানিন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি.সি.বি স্টিভেনসকে তারই বাসগৃহে গুলি করে হত্যা করে। ১৯৩০ সালে কৃষক আন্দোলনের সময় কংগ্রেস নেতা আব্দুল হাকিম খাজনা বন্ধের আহ্বান জানান। 
এ তো গেল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা। যদি সাহিত্যে-শিক্ষায়-গবেষণায় আসেন তাহলে পাওয়া যায়  ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আবদুল কাদির, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, ছন্দবিশারদ প্রবোধচন্দ্র সেন, মহাকাশ গবেষক আবদুস সাত্তার খান,  ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক ও অলি আহাদ , জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলী খান,  প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদসহ আরও অনেক গুণীজন রয়েছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। সে বিশাল এক অধ্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুছ মাখন, শাহজাহান সিদ্দিকী, শামসুল হক,  আবদুর রহমানসহ অসংখ্য খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার মাতৃভূমি। 
খেলধুলা, রাজনীতি, সংস্কৃতি সর্বত্রই কৃতিদের নাম ছড়িয়ে আছে। প্রাক্তন ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটার প্রবীর সেন এ জেলারই সন্তান তা আমরা জানিই না। আমাদের সময়ের মোহাম্মদ আশরাফুলও আছেন। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় প্রথম বাঙালী প্রেসিডেন্ট নওয়াব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারক অন্নদাচরণ রায় এ জেলারই পরিচয়। যদি সাম্প্রতিক কালের কথাও বলতে হয় তাহলে এমন অনেকেরই নাম আসে তাতেও অবাক হই। লোকসঙ্গীত শিল্পী অমর পাল, সঙ্গীত পরিচালক এবং সুরকার সুবল দাস, সঙ্গীত গবেষক এবং লেখক মোবারক হোসেন খান, সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, সুরকার শেখ সাদী খানের মতো আরও বহুজন আছেন । রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী আমলা, সেনা প্রধান এ কোটায় পাওয়ারফুল, হাই অফিসিয়াল অনেকেই আছেন। সে দীর্ঘ তালিকাই হয়ে যাবে। তাদের নাম নিতে ইচ্ছে করছে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই জেলাটিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আঁতুর ঘর বানাতে এরা বিষয়টি বুঝেও না বোঝার ভান করেছেন। দেখেও দেখেন নাই, ইগনোর করেছেন, গা বাঁচাইয়া নিজের পথ পরিষ্কার রেখেছেন। যার পরিনাম হিশেবে আপনাদের উত্তর প্রজন্মকে আরো কয়েক দশক এই পাপের বোঝা বইতে হবে। সব সরকারের কাছ থেকে সুবিধা ভোগ করেছেন। তারা নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন। কেউ মাতৃভূমির জন্য উদ্বিগ্ন হন নি। তারা যদি মাত্র দুইটা ইবলিশকে কনট্রোল করতেন, তাহলে এই জেলাটা প্রাণে বেঁচে যেতো। নাম দুইটা তো বলতেই হয়, এক নম্বর আমীনী, দুই নম্বর এই আজহারী। এরা মইরা অদৃশ্য হয়েছে ঠিক, কিন্তু আদতে মরে নাই। জন্ম দিয়ে গেছে নর্দমার হাজার হাজার কিলবিলে পোনা। যারা আগামী দিনের অন্ধ ধর্মসন্ত্রাসী...

সৌজন্যেঃ
শওকত আলী তারা।

0/Post a Comment/Comments

যুক্তি সংগত কথা বলুন.................

Stay Conneted