বিদ‍্যাসাগর

বিদ‍্যাসাগর

বিদ‍্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথকে আমি বাঙালির দুই মহত্তম আইকন মানি। নীরদচন্দ্র চৌধুরী একবার নিত্যস্মরণীয় ছজন বাঙালি মনীষীর একটা তালিকা বানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এবং আরও পাঁচজন। বিদ্যাসাগরের নাম ওই তালিকায় না থাকায় সেটি আমার তেমন মনোযোগ পায়নি। বাকি পাঁচজন কে কে ছিলেন আমার ভালো মনে নেই। নীরদচন্দ্র অবশ্য পরে একটা ব‍্যাখ‍্যা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর চরিত্রগুণে ইয়োরোপীয়দের মতন দৃঢ় ছিলেন বলে উনি তাঁকে বাঙালির মধ্যে ধরেননি। এই যুক্তি কতটা গ্ৰহণযোগ‍্য আমি জানি না। তবে আমি কোথায় যেন পড়েছি নীরদচন্দ্র অন‍্যত্র লিখেছিলেন যে প্রতিভায় ও চরিত্রমাহাত্ম‍্যে যাঁরা বাঙালির কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন তাঁদের মধ‍্যে বিদ‍্যাসাগর ছিলেন অগ্ৰগণ‍্য।

যুগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যাসাগর ছিলেন এক আশ্চর্য ব‍্যতিক্রম। তাঁর বিশ্ব ছিল মানবকেন্দ্রিক, তাঁর প্রায়-সমসাময়িক রামকৃষ্ণ পরমহংসের মতো ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয়। ইহজগতের বাইরে আর কোনও বিষয় নিয়ে বিদ্যাসাগরের প্রত্যক্ষ আগ্রহ ছিল না। ‘হ‍্যাঁ রে ললিত, আমারও পরকাল আছে নাকি’ জাতীয় কথা তাঁর মুখেই মানাত। শিক্ষার সার্বজনিকতা এবং সমাজের অত্যাচার থেকে মেয়েদের ত্রাণ – মূলত এই দুটি ক্ষেত্র নিয়েই তিনি সারাজীবন হাতে-কলমে কাজ করেছেন, অকাতরে ব্যয় করেছেন তাঁর শ্রম-অর্থ-সময়। অন্যদিকে পরমহংসের আরাধ্যা কালীর সঙ্গে কর্মের তেমন যোগ ছিল না, সেই পূজার অবিমিশ্র উপচার ছিল ভক্তি। এমন-কি পরবর্তী কালে পরমহংসের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ যখন মানবসেবার কথা বললেন, তখনও তিনি মনে করিয়ে দিলেন যে জীবসেবার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরসেবা হবে। ঈশ্বরলাভের কোনও ইচ্ছে না নিয়েও যে মানুষের মঙ্গলের জন্যই শুধু কাজ করা যায় এরকম বিশ্বাসে ঈশ্বরচন্দ্র সে-যুগে ছিলেন এক নিঃসঙ্গ পথিক। 

বিদ্যাসাগর সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন বিধবাবিবাহের প্রচলন করতে গিয়ে। সমাজে প্রভাবশালী অনেক লোকই তাঁর বিপক্ষে গিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ, যেমন রাধাকান্ত দেব, প্রথমে তাঁকে সমর্থন করেও পরে বিরুদ্ধতা করেছিলেন। তবে তাঁর পক্ষেও বহু মানুষ ছিলেন। বহু মানুষ বিধবাবিবাহের সমর্থনে আইন-প্রণয়নের দাবি জানিয়ে যৌথ-দস্তখত-সম্বলিত চিঠি দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারকে। সম্বাদ প্রভাকর বিদ্যাসাগরকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করত, কিন্তু সম্বাদ ভাস্কর ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সমর্থন ছিল তাঁর দিকে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যাসাগরেরই জয় হয়েছিল। কলকাতায় প্রথম বিধবাবিবাহ হয়েছিল কালীমতী দেবীর সঙ্গে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের। কালীমতীর প্রথম বিয়ে হয় চারবছর বয়সে, ছ-বছর বয়সে বিধবা হন। এখন আমরা ভাবতেই পারি না এইসব কথা। দেড় বছরে বিয়ে এবং আড়াই বছরে বৈধব্যের দৃষ্টান্তও ছিল। 

আমার সেই আত্মীয়া, বেঁচে থাকলে একশো বছর বয়স হত যাঁর, যদি অধ‍্যাপিকা মহোদয়ার তথ‍্যপ্রমাণহীন কদর্য কথাগুলি শুনতেন তবে কী বলতেন আন্দাজ করতে পারি না। ঠাকুরদেবতা নিয়ে তাঁর মাতামাতি ছিল না, কিন্তু বিদ‍্যাসাগরের ছবির সামনে তিনি হাতজোড় করতেন, বলতেন নারী হিসেবে ওটা তাঁর কৃতজ্ঞতা। ইদানীং অনেক বিরুদ্ধ কথা শুনতে পাই। বিদ‍্যাসাগরের উদ‍্যোগে কিছু রাঢ়ি ব্রাহ্মণ পরিবারে‌র বিধবা কন‍্যাদের পুনর্বিবাহ হয়েছিল বটে, কিন্তু বিদ‍্যাসাগরকে সেজন‍্য গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয়েছিল বিস্তর। সমাজমানসে তাঁর সংস্কারপ্রয়াস আর তেমন প্রভাব ফেলল কই! সমাজের তাবৎ মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি, কিন্তু নিজের স্ত্রীর লেখাপড়ার ব‍্যবস্থা কিছু করেননি তো! স্কুলপাঠ‍্য বই লিখে ও বিপণন করে ব‍্যবসা তো ভালোই করেছিলেন। এইসব। সমালোচকেরা মনে রাখেন না যে তাঁর কর্তব‍্যকর্মের আর্থিক দায়ও পুরোটা তাঁরই ছিল। বিদ‍্যাসাগরের ব‍্যর্থতা এই যে তিনি কোনও উত্তরসাধক তৈরি করে যেতে পারেননি। উনিশ শতকের শেষে বন্দে মাতরম্ মন্ত্রে অরবিন্দ-সহ হিন্দু বাঙালি যেমন উদ্বুদ্ধ হয়, তেমনই শিকাগোর ধর্মমহাসভায় বিবেকানন্দর তেজোদীপ্ত বক্তৃতায় হিন্দু বাঙালির আত্মপরিচয়ে গৌরবের ছটা লাগে। ধর্ম এক সাংস্কৃতিক পরম্পরা, নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ নিয়ে সসম্মানে বেঁচে থাকবার এক উপায় – এই বোধটি প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ঈশ্বরনিরপেক্ষ জীবনবীক্ষায় মনের শক্তি অনেক বেশি লাগে, গড়পড়তা মানুষের সে-শক্তি থাকে না। পরবর্তী কালের বঙ্গসমাজে বিবেকানন্দের ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানবধর্মের কাছে বিদ্যাসাগরের ঈশ্বরনিরপেক্ষ মানবধর্মের পরাভবের এটি একটি অন্যতম কারণ হতে পারে।

এ-সমস্তকিছু সত্ত্বেও তিনি আমার আইকন। তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর সময়টাকে দেখতে হবে। সময়ের সীমাবদ্ধতা তো থাকবে তাঁরও। যা তিনি করেননি বা করতে পারেননি তা দিয়ে নয়, যা তিনি করেছেন বা করতে পেরেছিলেন তা-ই দিয়েই মূল্যায়ন করতে হবে তাঁর। সমাজসংস্কার, শিক্ষার - বিশেষত নারীশিক্ষার - প্রসার, সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা ও সংস্কৃতে পাঠ্যবই রচনা, অনুবাদ ও সৃষ্টিশীল লেখাপত্র ... এসবের মধ্য দিয়েই চিনে নিতে হবে তাঁকে। চিনতে হবে তাঁর সংগ্ৰামের মধ্য দিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে শেষ করি। 'বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাঁহার স্বজাতি-সোদর কেহ ছিল না। এ দেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন চারি দিকের জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কার্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই। ... বৃহৎ বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গলের পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে বিদ্যাসাগর সেইরূপ বয়োবৃদ্ধি-সহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর ক্ষুদ্রতাজাল হইতে ক্রমশই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উত্থান করিয়াছিলেন, সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফল দান করিতেন, কিন্তু আমাদের শতসহস্র ক্ষণজীবী সভাসমিতির ঝিল্লিঝংকার হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিলেন। ক্ষুধিত পীড়িত অনাথ-অসহায়দের জন্য আজ তিনি বর্তমান নাই, কিন্তু তাঁহার মহৎচরিত্রের যে অক্ষয়বট তিনি বঙ্গভূমিতে রোপণ করিয়া গিয়াছেন তাহার তলদেশ সমস্ত বাঙালিজাতির তীর্থস্থান হইয়াছে।'
 
বিদ্যাসাগরের জন্মের দুশো বছর পূর্ণ হল আজ।

0/Post a Comment/Comments

যুক্তি সংগত কথা বলুন.................

Stay Conneted